রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

পিকে হালদারের সহযোগী ৮৩ জনকে নিয়ে তদন্তে দুদক

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : প্রশান্ত কুমার হালদার সংক্ষেপে পি কে হালদার হালের আলোচিত এক চরিত্র। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে পি কে হালদার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এখন তিনি ওই দুই প্রতিষ্ঠানেরই সাবেক কর্মকর্তা। কিন্তু তাঁর সাবেকি অনিয়ম-দুর্নীতি এখন হালনাগাদ হয়ে উঠেছে। বিদেশে পলাতক এই পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ।
টাকা লোপাট এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ নিয়ে কানাডায় পালিয়ে আছেন আলোচিত পিকে হালদার। বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে এই অর্থপাচারের ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি।
এরইমধ্যে তাকে গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন) থেকে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে সেটি নিয়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে অর্থপাচারে জাড়িয়ে পড়ায় সন্দেহভাজন ৮৩ জনের তালিকা করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। তালিকায় আসা সেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জানা গেছে,রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন পিকে হালদার। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বি আইএফসি) প্রভৃতি।
বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ পেয়ে পিকে হালদারের বিষয়ে শক্ত অবস্থানে হাইকোর্ট।
এরইমাঝে পিকে হালদারের সঙ্গে অর্থপাচারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে সন্দেহভাজন ৮৩ জনের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করেছে বিএফআইইউ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পি কে হালদারের সহযোগী সন্দেহজনক ৮৩ ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ আছে। পি কে হালদার ও তার ৮৩ সহযোগী ৪৩টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়ে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছে।
বিএফআইইউ’র ওই তালিকায় নাম আসা সন্দেহভাজন ৮৩ ব্যক্তি হলেন- প্রণবেন্দু হালদার ও লীলাবতি হালদারের সন্তান প্রশান্ত কুমার হালদার, গুলশানের আ. ফয়েজ মুজিবর রহমানের দুই ছেলে রেজাউর রহমান ও মিজানুর রহমান এবং মেয়ে সৈয়দা রুহি গজনভী, গুলশানের সায়েদুর রহমান খানের ছেলে  এম. নুরুল আলম, বনানী ডিওএইচএস’র শামসুল আলমের ছেলে মো. নওশের উল ইসলাম, তার স্ত্রী মমতাজ বেগম, বনশ্রীর বিমলাংশু চৌধুরী আশুতোষ চৌধুরী, বনশ্রীর নারায়ণ জুমদারের স্ত্রী উৎপল মজুমদার, বনানী ডিওএইচএস’র বসুদেব ভট্টাচার্য ও তার স্ত্রী পাপিয়া ভট্টাচার্য, পিকে হালদারের ভাই প্রিতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের কাজী মমরেজ মাহমুদ ও তার স্ত্রী আফরোজা সুরাইয়া মজুমদার, ঝালকাঠি রাজাপুরের প্রশান্ত দেউরি, গেন্ডারিয়ার মো. মোস্তাফিজুর রহমান, উত্তরার স্বপন কুমার মিস্ত্রি ও তার স্ত্রী পূর্নিমা রানী হালদার, মিরপুরের অমিতাভ অধিকারী, লালমাটিয়ার রাজিব সোম ও তার স্ত্রী শিমু রায়, পিরোজপুরের রতন কুমার বিশ্বাস।
আরও আছেন গ্রীন রোডের ওমর শরীফ, কুমিল্লার বরুড়ার উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও তার স্ত্রী অনিতা কর, উত্তরার উজ্জ্বল মল্লিক, নড়াইল লোহাগড়ার মোস্তাইন বিল্লাহ, পিরোজপুরের শাহ আলম শেখ, অনঙ্গ মোহন রায়, উত্তরার সোমা ঘোষ, বরিশাল বাকেরগঞ্জের অমল চন্দ্র ঘোষ, গাজীপুর কালিগঞ্জের সুবেদ কুমার ভৌমিক, নড়াইলের শেখ মইনুল ইসলাম মিঠু, সঞ্জীব কুমার হালদার, উত্তরার সুব্রত দাশ ও তার স্ত্রী সুভ্রা রানী ঘোষ, রামপুরা হাজিপাড়ার তোফাজ্জ্বল হোসেন, পিরোজপুরের স্বপন কুমার মিস্ত্রির ভাই উত্তম কুমার মিস্ত্রি, উত্তম কুমার মিস্ত্রির স্ত্রী অতশী মৃধা, গোপাল চন্দ্র গাঙ্গুলী এবং মোহাম্মদ আবু রাজিব মারুফ।
সন্দেহভাজনদের মধ্যে আরও আছেন- বাগেরহাট চিতলমারীর শঙ্খ ব্যাপারি (বর্তমানে গ্রেফতার), রাম প্রসাদ রায়, ইরফান উদ্দীন আহমেদ, শাহনাজ বেগম, জামিল মাহমুদ, ইমাম হোসেন, ধানমন্ডির অভিজিত অধিকারী, সুকুমার সাহা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা, ফেনী সদরের একেএম শহীদ রেজা, শওকত রেজা, জোবেদা বেগম, নাহিদ রেজা, একেএম হারুন অর রশিদ, মো. মোশাররফ হোসেন ভূইয়া, মো. শাহাদাত হোসেন, জামাল উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী, রাম প্রসাদ, শাহ্ আবরার ফাইয়াজ, মো. দেলওয়ার হোসেন, মিলন কুমার দাশ, পিরোজপুর সদরের অমল কৃষ্ণ দাস, বাগেরহাট মোড়লগঞ্জের মশিউর রহমান, পিরোজপুর সদরের সাব্বির আহমেদ, মো. মনিরুল ইসলাম, আসমা সিদ্দিক, কাজী মাহজাবিন মমতাজ, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. সোলায়মান চৌধুরী, মো. কামরুজ্জামান, নিকুঞ্জের মো. ইকবাল সাইদ, সিরাজগঞ্জ বেলকুচির অরুন কুমার কুন্ডু, মো. সিদ্দিকুর রহমান, মাহফুজা রহমান বেবী, ইনসান আলী শেখ, হাফিজা খানম, এনএম পারভেজ চৌধুরী, প্রশান্ত কুমার হালদারের মা লীলাবতী হালদার, অবন্তিকা বড়াল (বর্তমানে গ্রেফতার), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ঝারামপুরের মো. রেজাউল করিম এবং জেকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালে সত্ত্বাধিকারী ইরফান আহমেদ খান।
দুদক আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘পি কে হালদারের ঘটনায় সন্দেহভাজন ৮৩ জনের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলছে। এর বাইরে নতুন করে কাউকে যুক্ত করা বা বাদ দেওয়া হয়েছে কিনা, তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। দুদকের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি হাতে পেলে এ বিষয়ে বলা সম্ভব হবে। দুদকের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জেনেছি।‘
দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন জানান, ‘পিকে হালদারের অর্থপাচারের সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, পর্যায়ক্রমে তাদের সবার বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে শঙ্খ ব্যাপারি, অবন্তিকা বড়াল, সুকুমার সাহা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে পিকে হালদারকে?
দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া পি কে হালদারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়া জারি করতে গত ৪ জানুয়ারি পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে ইন্টারপোলকে চিঠি দেওয়া হয়। পরদিন à§« জানুয়ারি বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন এনসিবি’র এআইজি মহিউল ইসলাম। চিঠিতে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করার সুপারিশ করা হয়। এরপর à§® জানুয়ারি  পি কে হালদারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেন পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সোহেল রানা।
তিনি জানান, বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের কাছে যে আবেদন করা হয়েছিল সেই আবেদনে পি কে হালদারের সম্ভাব্য অবস্থান তুলে ধরা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাসহ আরও যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় ইন্টারপোলের কাছে। এরপরই ইন্টারপোল পি কে হালদারের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
রেড নোটিশ জারির পর কীভাবে পি কে হালদারকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) এআইজি মহিউল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সংস্থায় (ইন্টারপোল) রেড নোটিশ জারির জন্য প্রথমে আবেদন করতে হয়। তারপর এটা জারি হলে আসামীকে ধরার জন্য চেষ্টা চলতে থাকে। আর আমরা যেটা করি, মাঝে মাঝেই ইন্টারপোলের কাছে আসামীদের আপডেট চেয়ে মেইল করি।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইন্টারপোলের সহযোগিতায় যখন কোনও আসামী গ্রেফতার হয়, তখন তারা সংশ্লিষ্ট দেশকে বিষয়টি অবগত করে জানায় যে অমুক দেশ বা স্থান থেকে গ্রেফতার হয়েছে। পরে ওই দেশের পুলিশের মাধ্যমে আসামীকে আদালতে উপস্থাপনের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর শুরু হয় দেশে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া। ৪০ কার্যদিবসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করার একটা বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ বা বন্দী বিনিময় চুক্তি না থাকলে ইন্টারপোল সংক্রান্ত বিষয়ে দুদেশের পুলিশের যোগাযোগের মাধ্যমে আসামী হস্তান্তর হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রাষ্ট্রদূত বলেন, ইন্টারপোলের মাধ্যমে কোনও আসামীকে বিদেশে চিহ্নিত করা হলে ওই দেশের পুলিশ বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। এখানে দূতাবাস ও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় শুধু সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে অনেক সময় বিদেশে আসামী চিহ্নিত করার পরও ওই দেশ তাকে ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করতে পারে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আসামীকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যায়।
কোন কোন ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় জানতে চাইলে এই রাষ্ট্রদূত বলেন, আসামীকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেটি যদি অন্য দেশের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তবে আসামীকে ফেরত দিতে অস্বীকার করা হতে পারে। যেমন, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয় না সেসব দেশ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে হস্তান্তর করতে চায় না।
আর্থিক খাত থেকে আত্মীয়-স্বজনসহ চক্রের মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে। তবে এখন পর্যন্ত তার ৪০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। দুদক ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ পি কে হালদার এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে। এছাড়া দুদকের ক্যাসিনো মামলায় চার্জশিট তালিকায় লিজিং কোম্পানি ও আর্থিক খাত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচারেও তার নাম এসেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ